ঈদুল ফিতিরের আহবান: আসুন পথে বসা মানুষ গুলোর পাশে দাঁড়াই…

ওলীউর রহমান:: ঈদ আরবী ‘আওদ’ শব্দ থেকে নেয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো ফিরে আসা। মুসলমানদের ইবাদত কেন্দ্রীক আনন্দ উৎসবের দিন হল ঈদ। ঈদ যেহেতু বার বার ফিরে আসে এজন্য একে ঈদ বলা হয়। আমাদের সমাজে এমন অনেক লোক আছে যারা দারিদ্রতার কারণে ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারেনা। বিত্তবানদের ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দের সুবাতাস বইলেও ঐসব লোকের দোর গুড়ায় সুখ আনন্দের সুবাতাস পৌছেনা। ঈদের কেনাকাটার সামর্থ তাদের থাকেনা, ঈদ উপলক্ষে স্বতন্ত্র খাবারের আয়োজন তারা করতে পারেনা। আমাদের সমাজে যাদের ঘরবাড়ী নেই, বসবাসের একটা সুব্যবস্থা নেই, পরিধানের পর্যাপ্ত পোশাক নেই, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার যাদের ব্যবস্থা নেই, ঈদের দিনে তারা আলাদা খাবার, পিঠা-মিষ্টি, নতুন পোশাক, জুতো ও সাজ-গোজের আয়োজন করবে কিভাবে? এরা সাধারণত বিভিন্ন রেলষ্টেশন, বাসটার্মিনাল, শহরের ফুটপাত, ওভার ব্রিজের নীচে বা কোন মাজারের আশেপাশে বসবাস করে। এদের মধ্যে দুর্বল নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। ক্ষুধাও রোগ-বালাই, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক অবমূল্যায়ন, প্রাকৃতিক প্রতিকুলতা, ঝড়ঝঞ্ঝা সহ হাজারো সমস্যার সাথে এদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম। তাদের জীবনটাই যেন তাদের জন্য বোঝা। সমাজের এই শ্রেণীর লোকগুলো ঈদের আনন্দের চিন্তা করতে পারে কিভাবে?
দূরারোগ্য ব্যধীতে আক্রান্ত অনেক লোককে দেখা যায় ভিক্ষাবৃত্তি করে তাদের জীবন ধারণ করে। অনেক পঙ্গু, প্রতিবন্ধি আছে যারা ভিক্ষা বৃত্তিকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। ঈদের দিনে ঈদের নামাজে যাওয়ার সময়ও অনেক শিশু কিশুরকে ভিক্ষার ঝুলি কিংবা চটের বস্তা পিঠে ঝুলিয়ে ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়। তাদের বয়সের শিশু কিশুরেরা ঈদের আনন্দ উল্লাস করলেও তারা কিন্তু আনন্দ উল্লাসের পরিবর্তে বড়লোকদের উচ্ছিষ্ট কুড়াতে ডাস্টবিনে তখন হানা দেয়। ঈদের আনন্দ কাকে বলে এরাকি তা বুঝে? এদের এঅবস্থা দেখে বিদ্রোহী কবির অন্তরাতœা বেদনায় কেদে উঠেছিলো। তাই তিনি বলেছিলেন, এইযে মায়ের অনাদরে ক্লিষ্ট শিশু গুলি/ পরনে নেই ছেড়া কানি, সারা গায়ে ধুলি/ সারা দিনের অনাহারে শুস্ক বদন খানি/ ক্ষিধের জ্বালায় ক্ষুন্ন, তাতে জ্বরের ধুকধুকানি/ অযতনে বাছাদের হায়, গা গিয়েছে ফেটে, ক্ষুদ ঘাটা তাও জোটেনাক’ সারা দিন খেটে/ এদের ফেলে ওগো ধনী ওগো দেশের রাজা! কেমন করে রোচে মুখে মন্ডা মিঠাই খাজা?
আমাদের সমাজে অনেক শিল্পপতি, অনেক টাকা ওয়ালা, অনেক ডাক্তার, অনেক হাসপাতাল, অনেক ঔষধ, অনেক যন্ত্রপাতি, অনেক দাতব্য ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, অনেক মানবাধিকার সংগঠন ও অনেক সমাজ সেবী থাকা সত্বেও এই মানুষগুলোর এই দুরবস্থাকেন? আসলে এদের দিকে কেউ ফিরে থাকাচ্ছেনা। অল্প সাময়িক দান খয়রাত তাদের করা হলেও এর দ্বারা তাদের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছেনা। তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছেনা। সবশ্রেণীর মানুষকে নিয়েই আমাদের সমাজ। এই অসহায় অযতনে পড়ে থাকা লোকগুলোও আমাদের সমাজের অংশ। ওদের জীবনে শুধু দুঃখ থাকবে, কোন আনন্দ উৎসবে ওরা আমাদের সাথে শরীক হবেনা অথার্ৎ, কেউ করবে বিলাসিতা আর কেউ ক্ষুধায় কাতর, কেউ থাকবে পাঁচতলায় আর কেউ গাছতলায়, কেউ খাবে আর কেউ খাবেনা তা কি কোন সভ্য সুন্দর সমাজের বৈশিষ্ট হতে পারেনা।
দেহের কোন অঙ্গ যদি অসুস্থ্য হয় তাহলে এর ব্যথা বেদনা গোটা শরীরেই ছড়িয়ে পড়ে। অনুরূপ সমাজের কিছু সংখ্যক মানুষ যদি হয় ক্ষুধার্ত দুস্থ্য ও পীড়িত তাহলে এসমাজকেও সুস্থ্য সমাজ বলাযায়না। তাই এই ব্যথা বেদনা ও দুঃখ দুর্দশা জর্জড়িত মানুষ গুলির জীবনের মানুন্নয়নের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত সভ্যও সুন্দর সমাজের দাবী করা যাবেনা। ঈদ আমাদের কে এই অসহায় বঞ্চিত মানুষ গুলির পাশে দাঁড়াবার জন্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তাদের দুঃখ দুর্দশা ঘুছাতে, তাদের কান্না থামাতে, ঈদের আনন্দ তাদের সাথে ভাগাভাগি করে তাদের মুখে একটুকরো হাসি ফুটাতে ঈদ আমাদের অনুরোধ করে।
ঈদগাহের এক কোণে একটি ইয়াতীম শিশুকে কান্না করতে দেখে বিশ্বনবী সা. তাকে বুকে জড়িয়ে নেন এবং তাকে শান্তনাদিয়ে বলেন, ‘আজ থেকে আমি তোমার পিতা এবং আয়শা (রা.) তোমার মাতা।’ বিশ্বনবী করুনার ছবি, মাবতার কান্ডারী সা. বলতেন, যেব্যক্তি ধন সম্পদ রেখে মারা গেল তা তার আতœীয় স্বজনদের পাওনা এবং যেব্যক্তি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় অথবা ছোট ছোট শিশুদের রেখ মারা গেল তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব এবং তার ইয়াতীম শিশুদের অভিভাবকত্ব আমার উপর।-মুসলিম শরীফ
বিশ্বনবী সা. আরো একটি হাদীসে বলেন, সমস্ত মুসলমান জাতি মিলে এক ব্যক্তির মত। এক দেহের এক অঙ্গ যদি ব্যথিত হয় সারা অঙ্গ সেই ব্যথা অনুভব করে। এক চোখে ব্যথা হলে সারা শরীর সেব্যথা উপলব্ধি করে।-মুসলিম শরীফ। পবিত্র কোরআনে সূরা যারিয়াতের ১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে,‘ যাদের সম্পদ আছে তাদের সম্পদে ঐসব লোকদের অধিকার রয়েছে যাদের সম্পদ নেই।’ বিশ্বনবী সা. এর একটি হাদীসে আরো বিস্তারিত ভাবে বলা হয়েছে, ‘যেকোন মুসলমান অন্য কোন উলঙ্গ মুসলমানকে কাপড় পরিধান করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের সবুজ কাপড় পরিধান করাবেন। যেকোন মুসলমান অন্যকোন ক্ষুধার্ত মুসলমানকে আহার করাবে আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফল থেকে আহার করাবেন। যেকোন মুসলমান কোন পিপাসার্ত মুসলমানকে পানি পান করাবে আল্লাহ তাকে ‘রাহীকে মাখতুম’ থেকে পানি পান করাবেন।’ আবুদাউদ শরীফ
আজ যারা দারিদ্র্যতা ও অসহায়ত্বের কারণে ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারছেনা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব আমরা ব্যক্তিগত ভাবেও পালন করতে পারি আবার সামষ্টিগত ভাবে তথা সমাজিক ভাবে ও পালন করতে পারি। যাদের সামর্থ আছে তাদের যাকাত ফিতরা এবং অন্যান্য দান খয়রাতের টাকা যদি ওদের জন্য বরাদ্দ করাযায় এমনকি যাদের উপর যাকাত বাধ্যতা মূলক না, তারা যদি অন্তত ঈদের কেনাকাটার কিয়দংশ ওদের জন্য বরাদ্দ করতে পারেন তাহলে এই অসহায় মানুষ গুলির কিছুটা হলেও অবস্থার পরিবর্তন হবে। সামাজিক ভাবে আমরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি। প্রতিটি পাড়া মহল্লায় অনুসন্ধান চালিয়ে কাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থানেই তাদের তালিকা তৈরী করে যদি সামাজিক ভাবে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা যায়, বিত্তবানদের কাছথেকে অনুদান সংগ্রহ করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাযায় তাহলে হয়ত একসময় এই ছিন্নমূল মানুষগুলোর মাথা গুজার একটা ব্যবস্থা হবে এবং সমাজকে ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।
আমাদের যারা নেতা বা রাজনীতিবিদ, যারা জনসেবার কাজে অনেক টাকা পয়সা খরচ করেন তারা যদি ঐশ্রেণীর মানুষ গুলির দিকে অথার্ৎ এদের জীবনের পুনর্বাসনের প্রতি একটু নজর দিতেন তাহলে আশা করাযায় তাদের জনপ্রিয়তার মধ্যে অনেক বরকত হত। আর অমাদের দেশে অনেক বড় বড় খাদ্য প্রস্তুত কারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, পোশাক তৈরী এবং বিক্রয়কারী ও অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, অনেক বড়বড় ঔষধ কোম্পানী এবং চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে, রয়েছে বিশাল বিশাল আবাসন প্রকল্প। তারা তো সারা বছরই বিভিন্নভাবে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন, তাদের শ্রম দিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে টাকার বিনিময় হলেও তারা সারা বছর খাদ্যদ্রব্য, কাপড়চুপড় ও চিকিৎসাসেবা দেশবাসীর খেদমতে সরবরাহ করে যাচ্ছেন। আমি তাদেরকে বলব, আপনারা সারা বছরের মধ্যে একটি দিনের আয় ঐ পথেবসা লোকগুলোর জন্য বরাদ্দকরুন। কোন অসহায় মানুষযেন খাদ্যের জন্যে মানুষের দোয়ারে দোয়ারে হাত পাততে না হয়, বস্ত্রের অভাবে আর যেন কেউ বিবস্ত্র না থাকে, চিকিৎসার অভাবে যেন কেউ আর ভিক্ষার পথ বেছেনিতে নাহয় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপনারা এবিষয় গুলো একটু বিবেচনা করুন। এভাবে সরকারী বেসরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীরাও যদি একদিনের বেতন, শহরের ছোট বড় ব্যবসায়ীরা যদি একদিনের আয় এদের জন্য বরাদ্দ করেন এবং মাজার সমূহের নেয়াজ নজরানা বাবত যে আয় হয় এর কিছূ অংশ যদি ঐদুঃখী মানুষ গুলোর সাহায্যে প্রদান করাহয় এবং বিভিন্ন সেবা সংগঠন সমূহ যদি একাজে এগিয়ে আসেন তাহলে দৃঢ়তার সাথে বলাযায় এই পথেবসা দুঃখী মানুষ গুলোর কান্না থামানো যাবে, তাদের মুখে হাসী ফুটানো যাবে, তাদের থাকা খাওয়ার ও ভাসমান অবস্থা থেকে স্বাভাবিক জীবন যাপনের একটা ব্যবস্থা করাযাবে। এবিষয়গুলোর প্রতি আমাদের সবাইকেই আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।

About jnewsbd